প্রসঙ্গঃ গ্রামীন সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা

 

 

 

আবুল কালাম আজাদ॥

মফস্বল শব্দটির অর্থ শহরের বাইরের স্থান।যারা রাজধানীতে থাকেন তারা জেলা শহরকে মফস্বল বলে বিবেচনা করেন। আবার জেলাবাসী উপজেলাকে মফস্বল বলেন। এভাবে গ্রামও মফস্বল হিসেবে বিবেচিত। গ্রাম ছাড়া যেমন শহর/নগর গড়ে উঠেনি; সংবাদপত্রের বেলায় তেমন তাই।মফস্বল সাংবাদিক ছাড়া তেমনি পত্রিকা চলেনা।মফস্বল বা গ্রামীন সাংবাদিকের কারনেই ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সার্কুলাশন বৃদ্ধি পায়।যে পত্রিকায় মফস্বল সাংবাদিক যত বেশি ঐ পত্রিকার সার্কুলাশন তত বেশি। মফস্বলের সাংবাদিকের সংবাদ ছাপা হওয়ার কারনে গ্রামে গঞ্জে পাঠক বৃদ্ধি পায়।শুধু তাই নয়, ঢাকায় বসবাসকারীরা তাদের স্ব স্ব এলাকার খবর জানতে পত্রিকা কিনে থাকেন। সকাল বেলা পত্রিকাটি হাতে নিয়েই প্রথমেই তারা চোখ মেলে দেখেন তাদের এলাকার ঘটনা।মফস্বল সাংবাদিকের কারনেই এটা হচ্ছে।

মোস্তাকিম স্বাধীন আঞ্চলিক সংবাদদাতা নিবন্ধে লিখেছেন-“ সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক।জাতিকে লেখনির মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দেন তারা।জাতিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন কোথায় অপরাধ, কোথায় দুর্নীতি, কোথায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। সাংবাদিকের লেখনির মাধ্যমে প্রশাসন সজাগ হয় এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।“

আমরা পাঠক শ্রেনি বেশির ভাগই রাজধানী থেকে যেসব পত্রিকা বের হয় সেই সব পত্রিকাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু গ্রামিন বা মফস্বল পত্রিকাকে পাত্তাই দিতে চাইনা। অথচ গ্রামিন সংবাদপত্রের গুরুত্বও কম নয়।আমি গ্রামিন সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার গুরুত্ব নিয়ে আলোকপাত করছি।

গ্রামিন সংবাদপত্র বা মফঃস্বল সংবাদপত্র বা ক্ষুদ্র সংবাদপত্র বা তৃনমূল সংবাদপত্র কিংবা আঞ্চলিক সংবাদপত্র যে কোন পরিভাষায় ভাবা হোকনা কেন, আমরা শহরের বাইরে থেকে প্রকাশিত ক্ষুদ্র বা মাঝারি সংবাদপত্রকে এই স্তরবিন্যাসে স্থান দিতে চাই।

এ প্রসংগে – “ Rurral Press needed for National Development” শীর্ষক ডঃ গোলাম রহমানের একটি লেখা ১৯৮১ সালের ১১মে বাংলাদেশ ওবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিতহয়। গ্রামিন সংবাদপত্র বা ক্ষুদ্র / আঞ্চলিক সংবাদপত্র স্থানিয় খবরাখবর যতখানি গুরুত্ব এবং গভীরতা দিয়ে পরিবেশন করতে পারে ,তা জাতীয় সংবাদপত্রগুলো সেভাবে পরিবেশন করতে পারেনা। গ্রামিন সংবাদপত্রগুলো সাধারনতঃ জেলা সদর কিংবা উপজেলা/ থানা সদর থেকে প্রকাশিত হয়ে থাকে। এ সকল পত্রিকা স্থানিয় মানব সম্পদ এবং অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গ্রামিন জনগোষ্ঠি তথা কৃষকসমাজ এবং গ্রামে বসবাসকারী ৭০ শতাংশ লোকের বিরাট অবদান যেমন গভির ভাবে আমরা উপলব্ধি করতে ভুলে যাই, তেমনি গ্রামীন সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপট এবং দীর্ঘকাল থেকে চলে আসা বিদ্যমান অবস্থা তাও সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করা হয়না।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ উইলবার শ্র্যাম এক পর্যবেক্ষনে বলেছেন – In Developing Countries News Papers are born in idealism and live in frustration. Many most of them die in frustration ( E. Lannd).

‘’ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই উপমহাদেশে ভারতীয় স্বার্থের অনুকুলে ব্যাপকভাবে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে।আর্থিক সামর্থ্য- অসামর্থ্য প্রতিযোগীতার ক্ষমতা- অক্ষমতা বাধা হতে পারেনি।আদর্শই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে কাজ করেছে।“ ( তারাপদ পাল, ভারতের সংবাদপত্র-পৃষ্ঠা ২২)।

১৯৪৭ সালে উত্তর বাংলাদেশে কয়েকটি পত্রিকা ধিরে ধিরে ঢাকা থাকে প্রকাশ পায়।সময়ের চাহিদা এবং নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে সংবাদপত্রের উন্মেষ ঘটে। সে ক্ষত্রে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই সংবাদপত্রগুলির প্রকাশনায় নীতি নির্ধারিত হয়েছে। এক্ষেত্রে চলমান রাজনীতিকেই অনেক বেশি উদ্দিপ্ত করেছে।

১৯৬২ সালে ‘ দ্যা ব্রিটিশ কমিশন ব্রিটিশ সংবাপত্রের ব্যাপারে পর্যবেক্ষন করে অসন্তোষ প্রকাশ করে জাতীয় সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে সম্পাদক বিভাগ এবং প্রডাকশন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বোধ করেন। কমিশন আরো মনে করেন,প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যা নাকি গত ৫০ বছর ধরে হয়েছে তাকে কাজে লাগানো হচ্ছেনা।উন্নত প্রযুক্তি কাজে লাগানো হলে সংবাদপত্র প্রকাশে এবং বিতরনে ৩৪% জনবলক্ষেত্রে সাশ্রয় করা যেত। ( P.K Roy ‘Management in the Indian Press; Sings of stow progress).

১৯৫৪ সালে ভারতীয় প্রেস কমিশন লক্ষ্য করে যে, সামগ্রিক ভাবে প্রেসের অবস্থা খুব স্বস্তিকর নয়।কারন সম্পাদকের ভূমিকাকে ক্রমেই খাটো করে ফেলা হচ্ছে। আমাদের দেশে গ্রামীন/ আঞ্চলিক/ ক্ষুদ্র সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে বানিজ্যিক বিষয় আরো বেশি সন্নিবেশিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রধান স্থানে সংবাপত্রের অবস্থন। গনমাধ্যম একটি প্রভাবশালী ব্যবসা হিসেবে দেখা হয়। এজন্য গনমাধ্যমকে আজকের দিনে আঁকড় ধরে থাকতে চায় ক্ষমতা এবং সম্মানের হাতিয়ার হিসেবে।আমাদের দেশে গ্রামীন বা আঞ্চিলিক বা ক্ষুদ্র সংবাদপত্রগুলোর পরিস্থিতি এবং পরিবেশ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতায় এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতায় আকির্ন। সুদক্ষ জনবলের অভাব,পারিপার্শিক, অর্থনৈতিক সংকির্নতা – এসব মিলিয়ে সংবাদপত্রটিকে টিকে থাকার ব্যাপারে অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ধর্মীয় ও প্রেসার গ্রুপের চাপ ইত্যাদি সহ্য করে যেতে হয় প্রতিনিয়ত।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন মানেই হচ্ছে সংবাদপত্রের আয়ের উতস।বর্তমানে মিডিয়া তালিকাভূক্ত সংবাদপত্রগুলো সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়ে থাকে।আজকের মফস্বল / গ্রামীন সংবাদপত্রগুলোকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হতে হচ্ছে চারদিক থেকে। প্রথমতঃ- বড় সংবাদপত্র, দ্বিতীয়ত;- ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, তৃতীয়ত;-অনলাইন পোর্টাল এবং চতুর্থত;- সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি।সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে মানুষ এখন নিজেই গনমাধ্যমে পরিনত হয়েছে। মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছেন-‘Medium is the message’-er poriborrte ‘ man the messag media’ ব্যবহার অপ্রাসঙ্গিক হবেনা।ব্যক্তি মানুষ এখন গনমাধ্যমে পরিনত হয়েছে।মোবাইল ফোন, কম্পিউটার,ল্যাপটপ ও ইন্টারনেটের বদৌলতে ব্যক্তি নিজেই সঙ্গবাদ উতপাদন থেকে সম্প্রচার করছে।ফলে প্রথাগত গনমাধ্যমের চেয়ে ডিজিটাল মাধ্যমকে অনেক বেশি প্রভাবিত করছে।ব্যক্তি গনমাধ্যমের প্রভাবিত করার ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই বিভ্রান্তিকর তথ্য , ভুল তথ্য,ভুয়া সংবাদ ও গুজব ছরিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছ। এক্ষেত্রে গ্রামীন ক্ষুদ্র সংবাদপত্র তথা আঞ্চলিক সংবাদপত্র যে ধরনের কভারেজ দিতে পারে ।বিশেষ করে নিজস্ব এলাকার বিস্তৃত সংবাদ, ফিচার,ফটোগ্রাফ,এলাকার দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি, অপরাধ, উন্নয়ন,ইত্যাদি সংক্রান্ত অনুসন্ধানী রিপোর্টিং যা বড় সংবাদপত্র জাতীয় ভিত্তিতে অনেক সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজনে আঞ্চলিক সংবাদের গুরুত্ব তেমন ভাবে উপলব্ধি করেনা।আমাদের দেশে গ্রামীন সংবাদপত্রগুলোর ব্যাপারে অর্থনৈতিক টানপোড়নকেই বেশি দায়ী করা হয়।

১৯৯০-৯৭ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক টানাপোড়নের কারনে জেলা-উপজেলা থেকে প্রকাশিত ২০ টি দৈনিক এবং ৮ টি সাপ্তাহিক বন্ধ হয়ে গেছে ( পিআইবির সমিক্ষা)। পত্রিকা বন্ধ হওয়ার কারনগুলি হচ্ছে- কর্তৃপক্ষ, সাংবাদিক,ও কর্মচারিদের মধ্যে বিরোধ,আর্থিক সমস্যা,দক্ষতাসম্পন্ন সাংবাদিকের অভাব,সম্পাদকের পুর্বের পেশায় ফিরে যাওয়া,সম্পাদকের অন্য কগজে চাকরি নেওয়া,সরকারি নিশেধাজ্ঞা এবং প্রচার সংখ্যা কমে যাওয়া।

গবেষক কামরুল হাসান মঞ্জ গ্রাম- নগর সংবাদ প্রবাহের বৈষম্য;সমস্যা- সম্ভাবনা বিষয়ে নিবন্ধে লিখেছেন-বিস্তর সমস্যার বেড়াজালে আটকে আছে আমাদের স্থনীয় সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা। গ্রাম ও শহরের জন্ সংখ্যার আনুপাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়,৮০% লোক গ্রামে আর ২০% লোক শহরে বাস করে।কিন্তু জাতীয় সংবাদপত্রগুলো পর্যবেক্ষনে দেখা যায়, বেশিরভাগ সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে থাকে শহরের সংবাদ। গ্রামিন সংবাদ সেখানে উপেক্ষিত। এখানে গ্রাম ও শহরের সংবাদ প্রবাহের বৈষম্যকে প্রকট করে তুলেছে। খবরের পেছনে দৌড়ানোর পেশাগত আকাঙ্ক্ষা ও দৃঢ়তা সাংবাদিকদের অনেকের নেই।পত্রিকায় বসে বসে খবর পাওয়ার এই মনস্তান্তিক প্রতিবন্ধকতা স্থানীয় পত্রিকাগুলোর তথ্য সংগ্রহের ধরনটাকে দুর্বল ও নির্জীব করে রেখেছে। তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের অর্থ ব্যয়ের অনিহাও স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকদের তাজা সংবাদ পাওয়ার জন্য উপযোগী তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে।

আঞ্চলিক বা মফঃস্বল থেকেও যে, অনেক চিত্তাকর্ষক কিংবা চাঞ্চল্যকর খবর পরিবেশন করে পাঠককে আকৃষ্ট করা যায়, তা বহুবার প্রমান দিয়েছেন উত্তরাঞ্চলের চারন সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন।‘ সংবাদে গ্রামীন জনপদ , কৃষক- এসব বিষয় এত জড়ালোভাবে উঠে আসত যে,শহরের আড়ম্বরপূর্ন সমাজের পাশাপাশি গ্রামের নিরাভরন পরিবেশেও সংবাদপত্র পাঠের আকাংখা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল দৈনিক সংবাদ।দৈনিক সংবাদের পাতায় কৃষক ও গ্রামিন জনপদের কথা তুলে ধরে সংবাদের রিপোর্টার মোনাজাত উদ্দিন বাংলাদেশের সংবাদজগতে একটি ভিন্ন ধারাই সংযোজন করে ফেলেন।তা হল’ গ্রামীন সাংবাদিকতা’ এবং ‘চারন সাংবাদিকতা’ (সংবাদের আলোয় আলোকিত প্রবন্ধ, লেখক- সালাম জুবায়ের,চিফ রিপোর্টার, দৈনিক সংবাদ। নিরীক্ষা, এপ্রিল-জুন ২০১৯)। মোনাজাত উদ্দিন বা শামসুর রহমানের মত হয়ে উঠতে গেলে নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে সবকিছু দেখে-শুনে প্রতিবেদন লিখতে হবে। বাসায় বসে থানার কর্মকর্তার সাথে টেলিফোনে কথা বলে প্রতিবেদন লিখলে তা সংবাদ হবেনা কিংবা তাতে যে তথ্যের ঘাটতি থাকবেনা তা বলা যাবেনা।এজন্য কথা ওঠে সাংবাদিকের সুযোগ সুবিধা নিয়ে। সাংবাদিকের কারো জন্য সময় ফ্যাক্টর, আবার কারো জন্য অর্থ আবার কারো জন্যে বাহন ।অনেক সাংবাদিক আছেন যারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সংবাদ পাঠিয়ে যাচ্ছেন।পত্রিকা থেকে কোন পয়সা কড়ি বা সম্মানি কিছুই পাচ্ছেননা। এ ক্ষেত্রে তিনি ঘটনাস্থলে যাবেন কী করে? যাতায়াত, থাকা খাওয়া,এটা ওটা ব্যয় এগুলো কে দিবে? ফোন,ফ্যাক্স, ই- মেইল ,কম্পোজ করে সংবাদ/ষ্টোরি পাঠাতে কম খরচ হয়না। বেতনভাতা ও সম্মানী না পাওয়ায় বাড়তি খরচের কারনে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও আঞ্চলিক /গ্রমীন সাংবাদিকতাও বিকশিত হচ্ছেনা।
#আবুল কালাম আজাদ,( সাংবাদিক ও কলামিষ্ট) গুরুদাসপুর,
নাটোর, ০১৭২৪ ০৮৪৯৭৩

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.