নাটোরে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দাপটে কোণঠাসা নৌকা প্রার্থীরা!

নবীউর রহমান পিপলু ও নাইমুর রহমানতিন উপজেলা ঘুরে
নাটোরে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের হামলা ও বাধার মুখে পড়ছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা। জেলার সিংড়া ,বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক পাওয়া আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর প্রচারণায় বাধা দানের চেষ্টাসহ নৌকার সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। ভোটের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই দল মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে অবস্থান নেয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থকরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নৌকা সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকদের উপর হামলা করে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া এমনকি দলীয় প্রার্থীকে ঠেকাতে পুলিশের সাথে হাতাহাতিতে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

সিংড়া উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিকের পক্ষে নৌকার প্রচারণা চালানোর অপরাধে শেরকোল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও গোল-ই-আফরোজ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক কামরুল সরকারের বাম হাত ও পা ভেঙে দিয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী আদেশ আলীর সমর্থকরা। গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় উপজেলার নিংগইন-জোড়মল্লিকা ব্রীজ এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা তাকে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে হাত ও পা ভেঙ্গে দেয়। আহত ছাত্রলীগ নেতা মো. কামরুল সরকার শেরকোল ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি আফজাল সরকারের ছেলে।

একই দিনে বড়াইগ্রামে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারীর শোভাযাত্রায় হামলার প্রস্তুতির সময় বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সাথে পুলিশের ধাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে দাবী ডাঃ পাটোয়ারীর। এসব নিয়ে ভোটের প্রচারণা শুরুর আগেই থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে ওই চার উপজেলায়। খোদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পারস্পরিক এমন অসহিষ্ণু আচরণে আতঙ্কে রয়েছেন ভোটাররা। দলের তৃণমূল কর্মীরা নৌকাকে বিজয়ী করতে দলীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে জেলা আওয়ামীলীগ বিদ্রোহী প্রার্থী সহ তাদের সমর্থক দলের দায়িত্বে থাকা নেতৃবৃন্দকে সতর্ক করাসহ বিষয়গুলি কেন্দ্রিয় কমিটিকে অবগত করেছেন বলে জানিয়েছেন জেলা আওয়ামীলীগের এক শীর্ষ নেতা।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক। তিনি চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনেনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন শফিক। তবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের প্রাক-ভোটাভুটিতে প্রথম হয়ে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি। শফিক দলীয় মনোনয়ন পাবার পর হঠাৎ করেই একই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন সিংড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শেরকোল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আদেশ আলী সরদার। তিনি সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। রহস্যজনক কারণে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ নেতারা নেই নৌকার প্রার্থী শফিকের সাথে। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী আদেশ আলী সরদারের পক্ষে গণসংযোগ ও পথসভা করছেন। প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন শফিকের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার এক সমাবেশে সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র জান্নাতুল ফেরদৌস পৌর কমিটিতে তার রানিংমেট সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বেঈমানদের হাতে নৌকা মানায় না। নৌকা মীরজাফরদের মার্কা নয়।’ ওইদিন বিকেলেই নৌকার প্রার্থী শফিকের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় উপজেলার নিংগইন-জোড়মল্লিক ব্রীজ এলাকায় কামরুল সরকার নামে এক ছাত্রলীগ নেতার বাম হাত ও পা ভেঙে দেয় স্বতন্ত্র প্রার্থী আদেশ আলীর সমর্থকরা। কামরুল বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী আদেশ আলী এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করে বলেন, তিনি কাউকে আঘাত করার পক্ষে নন। যারা এই কাজ করেছে তারা ঠিক করেননি। নৌকার প্রার্থী শফিকের কর্মীর উপর তার সমর্থকরা হামলা করেনি। কারা করেছে তাও জানিনা। এ ঘটনার প্রতিবাদ ও ঘৃণা জানান তিনি। ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে বিচার হওয়া উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘সাধারন ভোটার সহ দলের অধিকাংশ নেতা কর্মীর ব্যপক চাহিদার কারনে তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর ও জননেত্রী শেখ হাসিনার নৌকার বিরুদ্ধে তিনি নন। সিংড়াবাসীর আহ্বানে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এবং সিংড়াবাসী তার সাথে রয়েছেন। কাউকে আঘাত করে নয়, জনগনের ভালবাসা নিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হবেন।’

এদিকে নৌকার সমর্থনে গণসংযোগকালে ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়ার ঘটনায় দলের তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এছাড়া দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা নৌকার প্রার্থী শফিকের পক্ষ না নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় হতাশা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তারা। তাদের মতে, নেতাদের অনেকেই শফিককে ‘গণবিচ্ছিন্ন’ আখ্যায়িত করলেও তৃণমূলের পছন্দে ভোটাভুটির শীর্ষে ছিলেন শফিক। তবুও শফিকের পাশে না থেকে অন্য প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় নেতারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক অভিযোগ বলেন, ‘কামরুলের অপরাধ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাকে নৌকা দিয়েছেন তার পক্ষে কাজ করা। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কামরুল নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন। অথচ এবার উপজেলা নির্বাচনে আমার পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে সে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী আদেশ আলী সারাজীবন বিএনপির রাজনীতি করে এসে এখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। এখন তিনি আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করা চেষ্টা করছেন।’

এদিকে গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী পৌর আওয়ামীলীগ প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘এই উপজেলায় দুই জন বিদ্রোহী প্রার্থী নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। তাদের একজন বর্তমান সাংসদের পালিত পুত্র আনোয়ার হোসেন নৌকার সমর্থকদের নানাভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে।’

বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনিও মনোনয়ন চেয়েছিলেন দলের কাছে। কিন্তু যাকে দেওয়া হয়ে ছে তার প্রতি মানুষের কোন আস্থা নেই। সাধারন ভোটার সহ দলের সিংহভাগ নেতা কর্মী তার পাশে রয়েছেন। জাহিদুল ইসলাম তার ভরাডুবি বুঝতে পেরে মিথ্যাচার করছেন।’

বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের আওয়ামীলীগের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী একই অভিযোগ করে বলেন, তার বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামীলীগ ঘোষণা দিয়ে নৌকার বিপক্ষে মাঠে নেমেছে। বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা তার শোভাযাত্রায় হামলা করার ষড়যন্ত্র করলে পুলিশের সাথে তাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

বিদ্রোহী প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন বাবলু এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও মিথ্যাচার উল্লেখ করে বলেন, ‘ডাঃ পাটোয়ারী বিগত দিনে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেননি। তাই জনগনের ইচ্ছায় তিনি প্রার্থী হয়েছেন। নৌকার প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়। তিনি নির্বাচিত হবেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর জননেত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতি ,মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে কাজ করবেন।’

জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোর্ত্তুজা আলী বাবলু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা নৌকার প্রতিপক্ষ হয়েছেন তারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের সাথে বৈঠক করতে গেলে তারা সৌজন্যও দেখায়নি। বিশেষ করে সিংড়া উপজেলার নেতৃবৃন্দ জেলার শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সম্মান জানায়নি। মঙ্গলবার জেলা কমিটির কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বৈঠক করতে সিংড়ায় গেলে তারা কেউ সাক্ষাত করেননি। তাদের ফোন বন্ধ করে রাখায় ফোন করেও তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। দলীয় কার্যালয়ে কয়েক ঘন্টা অপেক্ষার পর নেতৃবৃন্দ সিংড়া থেকে ফিরে আসেন। পরে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে যারা বা যে সব নেতা-নেত্রী অবস্থান নিয়েছেন তাদেরকে নৌকার পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দলের সিংড়া উপজেলা নেতৃবৃন্দের এমন অসৌজন্যমূলক আচরণ সহ বিদ্রোহী প্রার্থীদের আচরণ সম্পর্কে কেন্দ্রে জানানো হয়েছে। এছাড়া নৌকা প্রার্থীকে তার সমর্থকদের ওপর হামলার বিষয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য,প্রথম দফায় নাটোরের ৬টি উপজেলার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী না তাকায় সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নৌকা প্রার্থী শরিফুল ইসলাম রমজান,ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল সাকিব ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কামরুন্নাহার কাজল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। অপর ৪ উপজেলা সিংড়া,বড়াইগ্রাম,গুরুদাসপুর ও বাগাতিপাড়ায় আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ৬জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। লালপুর উজেলায় নৌকা প্রার্থীর বিরুদ্ধে জাসদ ইনুর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.